গদ্য

রূপাগ্রস্থতা

দেবাশীষ মজুমদার

rupa_sako_salauddin.jpg


সাঁকোর গল্প পুরনো হয়েছে বহুকাল,বিলুপ্ত স্মৃতি কামড়ে রয়েছি তবু। রূপা পেরিয়ে গিয়েছে বহুবার,শেষবারে ফেরেনি,শুধু যাবার গল্পের রেশ রয়ে গেছে। নেই সাঁকোটার কাছাকাছি এখন চৌরাস্তা,নাভি থেকে পথ এঁকে বেকে গ্যাছে,আরেকটু এগুলেই গোল পাহাড়,জিলিপি পাহাড়, খুলশি,কাজীর দেউরী, ওড়না লেইন,পাঞ্জাবী গলি। অথচ চৌরাস্তা ধরে আমি যতবার এগুই আমার সমস্ত পথ নেই সাঁকোটার কাছে চলে আসে। ওটা রূপা’র ছিল হয়তো কোনকালে, আমি স্রেফ অতিথি, কখনো নিমন্ত্রণে চোরা রোদের ওপিঠে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে গড়ানোর ভঙ্গিতে আমরা কথা বসাতাম। রূপা জানেনা, রূপাতো নির্ঘাত জানেনা কোজাগরী রাতে মধ্যবর্তী সেতুতে দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষায়, একজন ফিকে মানুষ, এখনো।


রূপাদের বাড়ির ছবি আমার ক্যালেন্ডারে চাপা পড়ে আছে। বর্গী-পাড়ায় জন্ম যেহেতু আমার কেবলই ছিনিয়ে নেবার লোভ, যতবার ও বাড়ি গেছি ততবার সোনাঝুড়ির সিঁড়ি ভেঙ্গে আমি টপকে গেছি তৃষ্ণার্ত বেপাত্তা কিছু স্মৃতি, বিনিময় প্রথা। একবার দেখি ‘ও’ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রয়েছে, আমার দিকে নয়, একুরিয়ামের সদ্য অতিথি গোল্ডফিসটার দিকে, যদিও ওই বন্দি মাছটার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, তবু বর্গী যেহেতু আমি তাই পুনরায় ছক পেতে বসি, মাছটা কিছু বুঝতে পেরেছিল কিনা জানিনা, শুধু দেখেছি রূপার পাশে দাঁড়ালেই সে লেজ নাড়িয়ে একুরিয়ামের গভীরে চলে যেতো। তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম রূপার চুলের দিকে, এমন আঁধার আমি জীবনে দেখিনি।


ওর সাথে বেড়াতে গিয়ে একদিন পাঁচ টাকার কয়েন ফেলেছিলাম যন্ত্রে,ভবিষ্যৎ ছাপা হয়েছিল ছোট্ট কাগজের টুকরোয় –অর্জুন তুমি,পাবেই দ্রৌপদীর ভালবাসা,কুরুক্ষেত্র থেমে গেলে। পড়ে, ঝর্না গলায় হেসেছিল রূপা। ঝর্নার ওই জল কি কেবলই জল, মাথার ওপরে এই যে আকাশ, সে কি আকাশের চাইতেও বেশি নয়! আমরা কেউ তখনো ততখানি নিসর্গ-শিকারি ছিলাম না, নতুবা আমার সব সমর্পণ, সব প্রতিবাদ, আধখানা জ্বরে পুড়ে যেতো। এখনো জানতে পারিনি আমাকে জরীপ করে কি পেয়েছিল রূপা। প্রস্তুতিবিহীন বিপন্নতা?


গভীর আয়নার সামনে অনাদিকাল একটা মেঘের পাশে দাঁড়িয়ে আছি, এখন আর আমার মধ্যে কোন কিন্তু নেই, অথচ মৃত্যুর অধিক তৃষ্ণা বুকে, মনে পরলে ব্যস্ত সময় এক লহমায় পিছিয়ে হপ্তা, মাস, বছর হিসেব নেই। চুমুর চেয়েও ঘনিষ্ঠ কিছু কি ছিল তোমার বিদায় সন্ধ্যাবেলা? অতটা দহন কি করে সহ্য করে আছি! আমার পতন-প্রবণ মন, আমার বুকের পাটাতন, লুকিয়ে রেখেছে বিষাদের ইন্সটলেশনগুলো। রাত জাগি, জুয়াড়ির মত ঢুলু ঢুলু চোখ নিয়ে, যন্ত্রণার চড়াই শরীর বেয়ে ওঠে, আমি ইতিহাস হাতড়ে কুহুভর্তি গেলাস খুঁজি। জানালা গলে হুমড়ি খায় বেগম আখতার – জোছনা করেছে আড়ি...


আজ যখন নিঃসঙ্গতার কথা ভাবছিলাম, নাটকীয়ভাবে বিদ্যুৎ চমকায়নি আকাশে। আমার কাছে রেখে যাওয়া রূপার সেই গোল্ডফিস আমাকে দেখতে পেয়ে তিনবার লেজ নাড়িয়েছিল। তাকে আমি রোজ খাবার দেই, স্নান করাই। তবু তার প্রতি বিদ্বেষ বেড়েছে, সে পুরনো বন্ধুকে ভুলে গ্যাছে খুব সহজেই, অথচ তার এবং আমার জয়েন্ট বুক ক্ষত বিক্ষত ছিল। মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসে, যে কথা রূপাকে বলিনি কখনো, গোল্ডফিস জানে। তার মৌন ভাষা আমি শুনতে পাই, বলে, শরীরও ভালবাসা, ভালবাসা উত্তাপ, তাকে যৌনতা বলা নিতান্তই অপরাধ বরং এসো কিছুদিন খুব কাছাকাছি থাকি।


করোটির শাঁসভূক গ্রন্থগুলো গড়াতে চাইছে জলে, হে ঈশ্বর যদি প্রেম দিলেনা প্রানে, তবে কেন খাঁচা দিলে বাঁধিবার। যদি ফিরে এসো এ শহরে কোন সন্ধ্যায়, যদি দেখ আকাশের গায়ে ভ্রুকুটির মত চাঁদ, আর সাঁকোতে দাঁড়িয়ে একটা ভাঙ্গা শরীর হৃদয়ের কাছে ক্ষমা চাইছে, রূপা তুমি চমকে যেওনা।




লেখকের তথ্য

শেয়ার করুন

anandamela-ad.jpg
anandamela-ad.jpg
anandamela-ad.jpg
anandamela-ad.jpg