গদ্য

পথে যেতে যেতে

নাজমুন নাহার

golpo_jete_jete_satkahan.jpg

সেবার (২০১৪ ) বই মেলায় যাবো। চিটাগাং থেকে রওনা দিতেই ফ্যাকরা । সিএন জি আমাকে রেল স্টেশনে না নিয়ে নিয়ে গেলো একদম পাহাড়তলী । আমি বললাম তুমি আমাকে এখানে নিয়ে আসছো

কেন ? জিজ্ঞেস করতেই সে বললো এখানেই তো তাকে আসতে বলেছি। ৩ টা বাজে ট্রেন । তখন বাজে ২.৪৫ । আমি তাকে হুংকার দিলাম আমাকে এক্ষুনি স্টেশনে নিয়ে যাও। তার ভাংগা সিএন জি দিয়ে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে চললো স্টেশনের দিকে। যখন পৌঁছালাম তখন তিনটা বাজার পাঁচ মিনিট বাকী। এর মধ্যে দেখি আর একটা ছেলে আর মেয়ে দৌড়ে দৌড়ে ট্রেনে উঠলো। মেয়েটা আমার পাশে এসে বসলো। পরে বুঝলাম তারা সহপাঠি।

আবার একই সাথে অন্যরকম একটা রিলেশন আছে তাদের মধ্যে।

ট্রেন ছাড়লে মেয়েটার সাথে গল্প করে সময় খারাপ কাটছিলো না। কিন্তু ট্রেন যখন কুমিল্লা গোপীনাথপুর ইমামবাড়ি রেল স্টেশনে আসলো তখন শুনি সামনে কোথায় নাকি ইঞ্জিনের বগি পড়ে গেছে ট্রেন আর চলবে না আজকের জন্য। তখন রাতের ৯.৩০ বাজে। এমন ভয় লাগলো আমার। কারণ আমি একা সাথে ছেলে হাজব্যান্ড কেউ নাই। তাড়াতাড়ি প্রেসারের ঔষধ খেয়ে নিলাম যাতে শান্ত থাকে মন। উত্তেজিত হয়ে প্রেসার না বেড়ে যায়।

যেখানে ট্রেন থেমেছে সেখানেই ছোট্ট একটা ভাতের হোটেল আছে। ট্রেনের সবাই নেমে ভাত খাওয়া শুরু করলো। আমার পাশের মেয়েটা বললো আপু চলেন নামি। মেয়েটার নাম ইতি আর তার সাথে ছেলেটার নাম জিম। ওরা দুজন সহ নামলাম। হোটেলে সবাই ভাত খেতে দেখে আমারো ক্ষিধেয় পেট মোচর দিয়ে উঠলো। বললাম চলো আমরা ভাত খাই। ওরা রাজি হলে গেলাম কিন্তু ততক্ষণে তরকারী শেষ প্রায়। তারা বললো শুধু ডিমের তরকারী আছে। অগত্যা তাতেই খেলাম। ক্ষিধে সত্যিই লাগছিলো। তার উপর গ্রামের চুলোয় রান্না। এমন মজা লাগলো।

আমার এক সময় মনে হলো আরে এখানে তো আমার ছোট খালুর বাড়ি। উনি এখানে হসপিটাল স্কুল কলেজ করেছেন। সেখানকার লোকজনকে খালুর নাম হাসান আজাদ বাদল জিজ্ঞেস করতেই তারা বললো এখান থেকে ৫ মিনিটের রাস্তা ওনার হাসপাতালের। এবং এখানে উনি খুবই বিখ্যাত মানুষ। একজন সোৎসাহে আমাদের নিয়ে রওনা দিল খালুর ওখানে। যেতেই দেখি খালুর বিশাল হাসপাতাল। অত্যাধুনিক ঝকঝকে তকতকে। এরকম অজ পাড়াগাঁয়ে এরকম হাসপাতাল আশাই করা যায় না। আমাকে ওনারা আগেই বলেছিলেন যে তাদের হাসপাতাল স্কুল কলেজ যেন দেখে আসি। রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতার মত মনে হল – দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে শুধু দুই পা ফেলিয়া। ”

খালুর হাসপাতালের গেটে যেতেই অবাক হলাম। এত সুন্দর ৫ স্টার টাইপের হোটেলের মতন হাসপাতাল। এখানে ঢুকলে তো মানুষের মনের সাথে শরীর ভালো হয়ে যাবে। জিম আর ইতিও অবাক হয়ে দেখছিলো। সেখানে আমরা ঢুকতেই হাসপাতালের দু একজন যারা ছিল তারা খালুকে খবর দিল। খালু থাকেন হাসপাতালের পাঁচতলায়। সেখানে কয়েকটা রুম নিয়ে একটা এপার্টমেন্ট করে নিয়েছেন। পুরো হাসপাতাল ঝকঝকে তকতকে। খালু বুঝতে পারলেন না কে এসেছে গ্রামের মধ্যে এই নিশিরাতে। গ্রামে রাতের দশটা তখন অনেক রাত। উনি আমাদেরকে দেখে তো অবাক। এত রাতে আমি এখানে কি করে আসলাম। বুঝিয়ে বলাতে উনি এত খুশী হলেন। কি খাব কি করবো উনি অস্থির হয়ে গেলেন। খালুকে বললাম খালু আপনি অস্থির হবেন না। আমি সব করছি। উনি বললেন আরে ভাগনী কি বলো। তুমি এই এত রাতে এখানে আসছো তাতেই তো আমি ভীষন খুশী। আমি নিজেই যেয়ে খাবার এটা সেটা বের করে জিম আর ইতিকে দিলাম আর আমিও খেলাম। ট্রেন ছেড়ে দিতে পারে এই টেনশনে জিম আর ইতি সহ আমি তাড়াতাড়ি ট্রেনে চলে যেতে চাইছিলাম। তার উপর চট্টগ্রাম থেকে আমার হাজব্যান্ড ফোন করে অস্থির করে ফেললো আমাকে। কি করবো না করবো। ও বললো তুমি থেকে যাও খালুর এখানে। পরের দিন খালুও ঢাকা যাবে ওনার সাথে যেন ঢাকা যাই। খালুও বললেন তুমি এক কাজ করো। আমার একজন লোক পাঠিয়ে দেই তোমার লাগেজ নিয়ে আসুক। জিম আর ইতিকেও থাকতে বললেন। জিম বললো তার নাকি কি কাজ ঢাকায় আর ইতির বোন ক্যান্সারের পেসেন্ট। সে যত রাতই হোক ঢাকা যাবে। তাকে যেতেই হবে। ওদের কোন রকমেই আটকে রাখতে পারলাম না।

খালু একজন লোক দিয়ে আমার লাগেজ আনিয়ে নিলেন। জিম আর ইতিকে বিদায় জানালাম। ওদের সাথে ট্রেনে অনেকটা সময় কাটিয়েছি। ওদের বিদায় দেয়ার সময় এত খারাপ লাগলো। ওরা চলে গেলে খালু আমার রুম দেখিয়ে দিলেন কোথায় থাকবো। আমি খেয়েদেয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু সেই রাতে কিছুতেই ঘুম আসলো না। জানালা দিয়ে দূরে দেখলাম। সব অন্ধকার। শীতের শেষ তখন। মনে হয় যেন সেদিন সব কবিতা চলে আসবে। একটা কেমন ঘোর ঘোর লাগছিলো। কোথায় যেতে চাইলাম কোথায় আসলাম। এ কেমন ব্যপার। ঘুম আসতে আসতে রাতের চারটা বাজলো। ৬ টা যখন বাজলো ট্রেনের ঝম ঝম শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বুঝলাম আমাদের সেই ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে ইমামবাড়ি স্টেশন। যদি এখানে না আসতাম তাহলে রাতটা ট্রেনেই কাটাতে হতো। তবু ট্রেনটা চলে যাওয়ায় একধরনের বিষন্নতায় আক্রান্ত হলাম। যা কিছু চলে যায় সব কিছুর জন্যই কি মানুষ বেদনা বোধ করে ? কে জানে ?

সকাল ৬ টা বাজতেই খালু ঘুম থেকে উঠে গেলেন। উনি খুব গোছানো মানুষ। ট্র্যাক স্যুট পড়ে মর্ণিং ওয়াকের জন্য রেডি। আমাকে বললেন তুমি আর একটু রেস্ট নাও। আমি ঠিক আটটা বাজে আসবো। এসে আমরা নাস্তা করবো একসাথে। খালু চলে যেতেই কিছুক্ষণ পর একটা মেয়ে ঢুকলো। সে খালুর রান্না করে আবার হাসপাতালের কেয়ারটেকার। সে দক্ষ হাতে নাস্তা বানিয়ে ফেললো। আর কথা প্রসংগে জানাল সে আগে বিউটি পারলারে কাজ করতো। কিন্তু এখানের পরিবেশ সব কিছু ভাল লাগাতে সে এখানেই কাজ করা শুরু করলো। আগে অনেক অভাব ছিলো। কিন্তু এখানে কাজ করাতে তার বাচ্চাকে স্কুলে দিয়েছে আবার হাজব্যান্ড ও বিদ্যুতে চাকরী করে এখন বেশ ভালো আছে। কথা বলতে বলতে সে ভাজি পরোটা রুটি আর ডিম ভাজি করে ফেললো। চা কফি দুইই করলো। আবার জুস ও দিলো। এর মধ্যে আর একজন মেয়ে এসে ঘর গুছিয়ে ঘর মুছে ফেললো। ঠিক আটটা বাজেই খালু আসলেন। এসে গোসল করে নাস্তা করতে বসলেন আমাকে নিয়ে। নাস্তা করতে করতে বললেন নাস্তা করে আমি অফিসে বসবো। তুমি রেডি হয়ে আসমার সাথে হাসপাতাল দেখবা। মেয়েটার নাম আসমা।

খালু নাস্তা করে হাসপাতালের অফিসে চলে গেলেন। হাসপাতাল টা গড়ে উঠেছে প্রায় বেশ কয়েক একর জমির উপর সম্ভবত। বারান্দা দিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখি দিগন্ত বিস্ত্রৃত সবুজ মাঠ। শীতের শেষ। কেমন যেন মন ভাল হয়ে যায় সব কিছু চোখে পড়লে। আসমা বললো আপু রেডি হন আমার সাথে হাসপাতাল দেখবেন। আসমাকে নিয়ে হাসপাতাল দেখতে চললাম। আসমা দেখিয়ে দিচ্ছে এটা সার্জারী রুম, এগুলো কেবিন, এখানে ডেন্টাল সার্জারী হয়, এগুলো সাধারণ বেড, এরপর অফিস / আলাদা করে ধোপার রুম, কিচেন, সুন্দর একটা টি স্টল। হাসপাতাল বাঊন্ডারীতে সুইমিং পুল, বড় মাঠ, মাঠে বাঘ, হরিণ, জেব্রার মূর্তি বসানো। দুপাশে চিকন রাস্তা আবার রাস্তার দুপাশে ফুল গাছে সাজানো। সুন্দর গাঁদা ফুল, ডালিয়া আরো নাম না জানা ফুল সৌন্দর্য বাড়িয়েছে রাস্তার। আবার মাঠের শেষ মাথায় সবজি বাগান। হাসপাতালের সবজি সব এখানে থেকেই সরবরাহ করা হয়।

এসব দেখে দেখে তো আমি মুগ্ধ। হাসপাতালের পাশেই একটা স্কুল এবং কলেজ। এগুলোও খালুর করা। খালু বলছিলেন যে দেখো মা আমার তো টাকার অভাব নেই। আমি মনে করি আমার সমাজের প্রতি একটা দায়িত্ব আছে। এই দায়িত্ব বোধ থেকেই এই সব করা বুঝেছো মা। তাছাড়া এই এলাকার প্রচুর মেয়ে এই হাসপাতালে কাজ করছে। খালু জানালেন যারা কাজ করছে তারা এখন অনেক ভালো আছে। নিজস্ব একটা ইনকাম থাকায় এখন নিজে স্বচ্ছল হয়েছে পরিবারকেও সাহায্য করছে। দেখে এতো ভালো লাগলো। দুপুরে আসমা আয়োজন করলো এত খাবারের। মেয়েটা আমাদের সংগ দিয়েছিলো আবার এক ফাঁকে রান্নাও করলো। লাউ এর পাতার ভর্তা প্রথম খেলাম। মাছ, মাংস ডাল ,সবজি, সালাদ কোনটা যে সে করে নাই আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। আর তার রান্না যে কত ভাল। মনে হয় জিভে স্বাদ লেগে রয়েছে। বিকেল ৪ টায় খালু আর আমি ঢাকার দিকে রওনা হলাম। খালু অনেক রসিক আবার খুব গল্প করতে পারেন। এত মজার মজার গল্প করলেন আমার মনেই হল না রাস্তাটা এত বড়। খালুর সাথে আর বাসায় গেলাম না যদিও খালা বলে রাখছিল তুই কিন্তু বাসায় চলে আসবি। আমি উত্তরায় আমার বোন সালমার বাসায় নেমে গেলাম। এরকম সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে গেলাম যা জীবনে ভোলার না। পরের দিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই বই মেলায় গিয়েছিলাম। সে আর এক অভিজ্ঞতা। আবার অন্য সময় শেয়ার করা যাবে সেই আনন্দময় অভিজ্ঞতা।




লেখকের তথ্য

শেয়ার করুন

anandamela-ad.jpg
anandamela-ad.jpg
anandamela-ad.jpg
anandamela-ad.jpg