গদ্য

চক্রব্যূহ

জিনাত জাহান খান

jinat_story.jpg

একটা দুপুর আগুন

দুইটা নূপুর ফাগুন

জোনাক জ্বলা লগন

পুড়ছে কিছু স্বপন ...

কিছু হল কি? ভেবে পায় না সুহিতা,আসলে এভাবে একা থাকলে কোন কিছু নিয়ে ভাবতে কিন্তু বেশ লাগে।মাঝে মাঝে চিন্তার চোখে রুমাল বেঁধে কানামাছি খেলতেও দারুণ লাগে!এই খেলাটাতে কোন ছক কাটাকাটি নেই –ছক কাটতে হয় এমন খেলাকে ভয় লাগে,সারাদিন বৃত্তঘেরা ছকে বাস করছে বলেই...নির্ধারিত জীবনেরও একটা ছন্দ আছে,আবিষ্কার করতে শিখছে সুহিতা।কখনো কখনো শুয়ে থাকলে হাতের মুঠোয় পৃথিবীর ঝুঁটি চেপে রাখে নিজের চিন্তায়।এটাও হয়ত কোন খেলা...ঘরের নষ্ট টেলিফোনটাকে কানে চেপে ধরে অনেকক্ষণ কথা বলে অপরিচিত মানুষের সাথে কিংবা ছোটবেলার পুতুলের বাক্সে যোগ করে নতুন কোন নিজের তৈরি মেয়ে পুতুল,পুতুলের শাড়ি পাল্টাতে খুব ভালো লাগে।

সুহিতা। একজন নারী । একটি নাম । একটি বিস্ময় । একটি ভালোবাসা । একটি রহস্য।অথচ ভালোবাসার রহস্য সে কোনদিনই খণ্ডন করতে পারে নি।সবকিছু অধরা আজও তাঁর কাছে।কারণ কোনোদিনই সে নিজেকে নিজের মতো করে দেখার সুযোগ পায়নি। প্রথম রক্ত দিয়ে যে আয়না তৈরি কিরেছিল, নিজেকে দেখার পূর্বেই ভেঙ্গে গেছে তা,তবু ভালবাসা নামক কোন ভাইরাসে আক্রান্ত হতেই ব্যাকুল থাকত --

সুহিতা যেদিন জেনেছিল ভালোবাসা কি সেদিন প্রচণ্ড কেঁপেছিল বিগব্যাং হয়ে,পৃথিবী সৃষ্টি নয় নিজেকেই নতুনভাবে সৃষ্টি করেছিল। যেন সেই আগুন দুপুর আর জোনাকিদের জ্বলে ওঠার আলোয় আলোকিত সে।তারপর সুহিতা অনেক ভেসেছে - অনেক ডুবেছে - অনেক ভিজেছে , যেন কোন সোনালি মাছ।একসময় যে স্বপ্ন দেখত,সেই সবপ্নের আলোকে একটা দেশলাই বাক্স নিয়ে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে গেছে দিনের পর দিন। জোনাকি প্রতিনিয়ত খেলা করত তাঁর চোখে আজ তারা তার কাছে ভালোবাসা হয়ে জ্বলে ওঠার উপাদান ।

খুব ভালবেসেছিল সে তার ভালবাসাকে,একদিন দেখা না হলে পাগলের মতো আগল ভেঙ্গে দৌড়ে ছুটে যেত।সুহিতার কাছে সে সুহিতাকে চেয়েছিল,দ্বিধাহীন তুলে দেয় সুহিতা।তারপর থেকে সে কি আলো আর আলো,রাত-দিন সব সময় ই জ্বলে ওঠা আলোয় ডুবে থাকত ওরা...চোখের রেটিনায় সবুজ আলোকে দূরঘাটের ফেরীর আলো ভাবেনি কখনো ভুল করে হলেও সুহিতা – কারণহীন তার ভালবাসা ফিরে যায়,যে পথ থেকে এসেছিলো স্রোত নেমে গেছে তা দ্রুত যেন নিয়ম পালন করেছে ...

সুহিতা বুঝতে পারে ভালবাসা খুব সহজেই যে কারো জীবনেই আসতে পারে আবার খুব সহজেই চলেও যেতে পারে।মানুষ তবুও কিন্তু প্রতিনিয়ত ভালো বেসে বেসে নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।ওর কিন্তু শেষ হতে ইচ্ছে জাগেনি বরং নিজেকে যেন চিনে নিল এমন করে।

একদিন যে জীবনকে বিষ মনে হয়েছিল,চোখের সামনে চলতে চলতে কখন যে সেই বিষ আগুনে পুড়ে জলে ধুয়ে উপাদেয় হয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি সুহিতা। কতটা আঁধার যে কতটা অন্ধকার নিয়ে আসতে পারে,শিখছে।এ শিক্ষা চায়নি কোনদিন।সমাজে পারবে না ফিরে আসতে,হাতের কাছে কোন নষ্ট টেলিফোনও পাচ্ছে না,যেখানে বলবে ওর সব কথা।কত কত যে হাত হাতছানি দিয়ে ডাকে,কোন হাত কতটা বিশ্বস্ত জানে না সুহিতা...

ভালবাসা নয় বাঁচার জন্যে সুহিতা বিস্তীর্ন পথ হয়ে যায়,আর পথিকেরা তাদের পদচিহ্ন দিয়ে পথকে সাজায় । সুহিতার পা থেকে চুল যে বিস্তীর্ন পথ তা যেন পথিকের প্রিয় মহাকাব্য পাঠের উপাদান হয়ে ওঠে আর সুহিতার প্রতিটা অক্ষরে অক্ষরে পাঠকের কলমের লাল দাগে পাঠকের অস্তি-মজ্জায় আত্নস্ত হয়ে গেলে, মহাকাব্য হয়ে উঠে শুন্য সুরমাদানির মতো।তারপর সুহিতা ধারন করে পথিকের চিহ্ন।একটা গভীর জলাশয়ে যেন এক ফোঁটা বুদবুদ,নিজেকে পথ করেছিল যে জীবনের তাগিদে সে জীবনের পথিকরা শুধু হেঁটে যেতে জানে,থামতে জানে না। পদচিহ্ন নিয়ে সুহিতা দাঁড়ায় – যেখানে পাশে থাকে না কোন পথিক।তারা চলতেই পথের টানে।

এবার সুহিতা জানে বেঁচে থাকার মন্ত্র। আর মন্ত্র জানে বলেই সে মায়াহীন পথিকের মত হারিয়ে যায় না। পথিকের চিহ্ন মুক্তোকে ঝিনুকের মতো বুকে পোষে,পাঠকের রেখে যাওয়া লাল দাগে হাত বোলায়, ঠোঁট ভেজায়। তার জীবনে আসে নতুন সকাল।নতুন সকাল যেন সমস্ত মুস্কিল মুছে দেয়ার আস্ত এক্তা সুর্য,নাম দেয় সুবাহ।

সুবাহকে নিয়ে সুহিতা পা বাড়ায় আলোর দিকে। সেখানে কত কত রাত্রিখোর ঘুরছে , তাদের তোয়াক্কা না করেই পথে পথ খোঁজে ওরা । আর অসংখ্য ভাঙ্গা কাঁচের ফাঁক গলে চলতে থাকে ধীর পায়ে। হ্যাঁ চলছে ।হঠাৎ একদিন সামনে আসে কেউ একজন যেন বটগাছ হয়ে ।না এটা ওর মনের তৈরি করা কোন প্রতীকমানুষ নয়,সত্যি একটা হাত সুহিতার মাথায় আসে,ছায়া পেয়ে ভুলে যায় পেছনের লাঞ্চনা।এই ছায়ায় আশ্রয় পেয়ে সুহিতা স্বপ্ন দেখে সুবাহকে নিয়ে বাঁচার।ওরা বাঁচে সংগ্রাম করে,যুদ্ধ করে যাচ্ছে একটা গোটা জীবনের সাথে কিংবা একটা গোটা সমাজের সাথে,ভাল থাকাই এখন মূল লক্ষ্য।থাকছে এভাবেই,এটাই বা কম ভালো হবে কেন,আর তাই সুবাহ বেড়ে উঠছে,পেছনে ফেলে অসংখ্য সকাল...

এমনই একদিন সকালে সুহিতা শুনতে পায় সুবাহ গাইছে –

একটা দুপুর আগুন

দুইটা নূপুর ফাগুন

জোনাক জ্বলা লগন

পুড়ছে কিছু স্বপন ...

বুকের মধ্যে শূন্য হয়ে যায় সুহিতার,নিজেকে আয়নায় দেখার সাধ কি এভাবেই পূরণ হয়?ও চায় না সুবাহ কখনো পুতুল খেলুক,যে জীবন ফেলে এসেছে তা ফিরে আসাকে কি বলে জানতেই চায় না সুহিতা,শুধু সুবাহকে সকাল থেকে আরও নতুন সকাল দিয়ে যেতে চায় ...




লেখকের তথ্য

শেয়ার করুন

anandamela-ad.jpg
anandamela-ad.jpg
anandamela-ad.jpg
anandamela-ad.jpg